সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন -
হোম ইতিহাস ও ঐতিহ্যরবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ ক'টা বছর

রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ ক’টা বছর

হারুন-অর-রশিদঃ ২২ শে শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ/ ৭ই আগস্ট ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ; ফুলে-ফুলে সজ্জিত কবিগুরু তখন চিরঘুমে শায়িত। জোড়াসাঁকোয় তিল ধারণের জায়গা নেই। বাইরেও অপেক্ষমান লক্ষ লক্ষ মানুষ। সকলেই যেনো বিশ্ব চরাচরে রহস্যভেদকারী মহাকবির শবদেহকে শেষবারের জন্য কাঁধে নিতে চান।

প্রয়াণের চার বছর আগে থেকে অসুস্থতা শুরু। বয়স যে বাড়ছিল তা যেন অনুধাবন করতে পারছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অসুস্থতার বহর বেড়েই চলেছিল। তবু থামছে না কবির লেখনি। আরও আরও নতুন সৃষ্টির জন্য মেতে উঠেছেন তিনি। এমনই সময় ১৯৩৭ সালে কিডনির সমস্যাটা গুরুতর আকার ধারণ করলো।

সালটা ১৯৪০; শরীর সায় দিচ্ছে না। তবু পাহাড়ের প্রকৃতির টানে আর পুত্রবধূ প্রতিমাদেবীকে দেখার জন্য শান্তিনিকেতন থেকে কালিম্পং গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দিনটা ছিল ১৯ সেপ্টেম্বর। কিন্তু, বেশিদিন কালিম্পং-এর আবহাওয়া সহ্য হল না কবিগুরুর। ২৬ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

কালিম্পং-এর বাড়িতে যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট কবিগুরু। ব্যাথা যেন সহ্য হয় না। দার্জিলিং থেকে এলেন সিভিল সার্জন। কবিগুরুর শারীরিক পরীক্ষা করে মত দিলেন অবিলম্বে অস্ত্রোপচারের। এমনটা না হলে যে কবিগুরুর প্রাণ সংশয় হতে পারে তাও বলে দিলেন সেই সিভিল সার্জন। কিন্তু, প্রতিমাদেবী ও মৈত্রেয়ীদেবী- কেউই অস্ত্রোপচারের পক্ষে ছিলেন না। অসুস্থ শরীর নিয়ে কলকাতায় নয়; কবি তখন ফিরতে চাইছেন শান্তিনিকেতনে। সময় যে ফুরিয়ে আসছে তা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন তিনি।

১৯১৬ সাল থেকে কবির চিকিৎসা করছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক নীলরতন সরকার। তিনি কোনও দিনই কবির অস্ত্রোপচারের পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু, ১৯৪০ সালে যখন কবি গুরুতর অসুস্থ হলেন তখন গিরিডি-তে নীলরতন সরকার। স্ত্রী বিয়োগের পর সেখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। রবীন্দ্রনাথের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে দেখলেন বিখ্যাত চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়। তিনিও সায় দিলেন অস্ত্রোপচারের।

কবি-কে জানানো হয়েছিল অস্ত্রোপচার করিয়ে নিলেই আচ্ছন্নভাবটা কেটে যাবে এবং তিনি ফের সুস্থ শরীরে লেখার কাজ করতে পারবেন। এত বড় একটা সিদ্ধান্তের কথা কিন্তু জানতেই পারেননি নীলরতন সরকার। কবির আশপাশে তখন যারা ছিলেন তারা কেউ ডা. নীলরতন সরকারকে খবর দেওয়াটা প্রয়োজনই মনে করেননি। অথচ, কবি নাকি বারবার জানতে চেয়েছিলেন ডা. নীলরতন সরকারকে খবর দেওয়া হয়েছে কি না।

ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে শরীর আর মন। থমকে যেতে চাইছে হাতের গতি। তবু অনড় কবি। আধশোয়া অবস্থাতেই লিখে চলেছেন জীবনের শেষ অধ্যায়ের অভিজ্ঞতা। যা ফুটে উঠছে ‘রোগশয্যা’, ‘আরোগ্য’, ‘জন্মদিন’-এর মতো রচনায়।

কলকাতা থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় ট্রেনে করে শান্তিনিকেতনে আনা হল কবিগুরুকে। যে কবির স্বতস্ফূর্ততায় মেতে থাকত শান্তিনিকেতনে সেখানে তখন এক বিষাদের ছায়া। সকলেরই চোখ ছলছল করছে। যে প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেই কবির সারাটা দিন কেটে যেত সেই কবি প্রায় নিশ্চুপ। কোনমতে হাত তুলে সাড়া দিচ্ছেন তিনি।

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের শেষ দিনগুলোতে কখনও তিনি শয্যাশায়ী, কখনও মন্দের ভাল। শেষের দিকে ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই, শান্তি নিকেতনের আশ্রম বালক-বালিকাদের ভোরের সঙ্গীত অর্ঘ তিনি গ্রহণ করেন তাঁর উদয়ন গৃহের পূর্বের জানালার কাছে বসে। উদয়নের প্রবেশদ্বার থেকে ছেলেমেয়েরা গেয়ে উঠেন কবিরই লেখা- ‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার, আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হল আজ’।

শান্তি নিকেতনে কবি এর মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দেহ আর চলছিলনা। ডাক্তাররা পরামর্শ করে ঠিক করলেন,অপারেশন ছাড়া উপায় নেই। ৯ শ্রাবন ৭০ বছরের স্মৃতি জড়িত শান্তি নিকেতন থেকে কবিকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হলো। কবি কি বুঝতে পেরেছিলেন এই তার শেষ যাত্রা? যাবার সময় চোখে রুমাল দিচ্ছেন দেখা গেছে।

২৫ জুলাই বেলা তিনটা ১৫ মিনিটে রবীন্দ্রনাথ এলেন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে।খবরটা গোপন রাখায় স্টেশনে কিংবা বাড়িতে ভিড় ছিল না। পুরোনো বাড়ির দোতলায় ‘পাথরের ঘর’-এ তিনি উঠলেন। স্ট্রেচারে করে দোতলায় নিতে হলো তাঁকে। ২৬ জুলাই রবিঠাকুর ছিলেন প্রফুল্ল। ৮০ বছরের খুড়ো রবীন্দ্রনাথ আর ৭০ বছর বয়সী ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ অতীত দিনের নানা কথা স্মরণ করলেন। হাসলেন প্রাণখুলে। ২৭ জুলাই সকালে রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে বললেন একটি কবিতা, টুকে নিলেন রানী চন্দ। কবিতাটির প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তি হলো: ‘প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল সত্ত্বার নতুন আবির্ভাবে, কে তুমি, মেলে নি উত্তর।’

৩০ জুলাই ঠিক হয়েছিল তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার হবে। কিন্তু সেটা তাঁকে জানতে দেওয়া হয়নি। তিনি ছেলে রথীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবে অপারেশন হবে’। রথীন্দ্রনাথ বললেন, ‘কাল-পরশু’। আবার রানী চন্দকে ডাকলেন কবি, লিখতে বললেন: তাঁর শেষ কবিতা- ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি, বিচিত্র ছলনাজালে হে ছলনাময়ী।’

ডা. ললিত এলেন একটু পরে। বললেন, ‘আজকের দিনটা ভালো আছে। আজই সেরে ফেলি, কী বলেন?’ হকচকিয়ে গেলেন কবি। বললেন, ‘আজই!’ তারপর বললেন, ‘তা ভালো। এ রকম হঠাৎ হয়ে যাওয়াই ভালো।’

জোড়াসাকোর মহর্ষিভবনে দোতালার পাথরের ঘরের পূর্বদিকের বারান্দায় তৈরি করা হলো অস্থায়ী অপারেশন থিয়েটার। বেলা ১১টায় স্ট্রেচারে করে অপারেশন- টেবিলে আনা হলো কবিকে। শরীরে যথেষ্ট যন্ত্রণা হয়েছিল অপারেশনের সময়। কিন্তু তা বুঝতে দেননি কবি। সেদিন ঘুমালেন। পরদিন ৩১ জুলাই যন্ত্রণা বাড়ল। গায়ের তাপ বাড়ছে। নিঃসাড় হয়ে আছেন। ১ আগস্ট কথা বলছেন না কবি; চিকিৎসকেরা শঙ্কিত! ২ আগস্ট, ৩ আগস্টও শরীরের কোনো উন্নতি নেই। ৪ আগস্ট সকালে সামান্য কফি খেলেন, জ্বর বাড়ল; সারাক্ষণ একটা ঝিমুনিভাব তাঁকে যেন গ্রাস করে ফেলতে চাইছে।

অবশেষে খবর পৌঁছালো গিরিডিতে। উদ্বিগ্ন চিত্তে তাড়াতাড়ি কলকাতায় এলেন ডক্টর নীলরতন সরকার। ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে সোজা চলে গেলেন কবির কক্ষে। মহর্ষিভবনের দোতালার ঘরে তখন নিস্তবদ্ধতা। কবি প্রায় জ্ঞান হারিয়েছেন। কবির নাড়ির স্পন্দন অনুভব করার চেষ্টা করলেন ডক্টর সরকার। রাতে স্যালাইন দেওয়া হলো কবিকে। অক্সিজেন আনিয়ে রাখা হলো। পরম মমতায় কবির কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। চোখ ছলছলে। কারোর সঙ্গেই সেভাবে কথা না বলেই উঠে গেলেন বাইরে দাঁড়ানো গাড়িতে।

৬ আগস্ট বাড়িতে উৎসুক মানুষের ভিড়। হিক্কা উঠছিল কবির। পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ডাকছিলেন, ‘বাবা মশায়!’ একটু সাড়া দিলেন কবি। রাত ১২টার দিকে আরও অবনতি হলো কবির শরীরের।

জোড়াসাঁকোর বাড়ির সামনে তখন রাতারাতি পিলপিল করে জমতে শুরু করেছে মানুষের ভিড়। কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত এমনকী দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসছে মানুষের দল। আকাশবাণীতে সমানে কবীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে আপডেট দেওয়া হচ্ছে। ঠাকুরবাড়ির পরিস্থিতি নিয়ে খবর রাখছেন মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহরুরাও। বাংলার ইংরেজ সরকারও পরিস্থিতির উপরে নজর রেখে যাচ্ছিল তখন।

২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ সকাল ৯টায় কবিকে অক্সিজেন দেওয়া হল। শেষবারের মতো তাঁকে দেখে গেলেন চিকিৎসক বিধান রায়, ললিত বন্দ্যোপাধ্যায়। কবির কানের কাছে চলছে অবিরাম মন্ত্রোচ্চারণ- তাঁর জীবনের বীজমন্ত্র ‘শান্তম, শিবম, অদ্বৈত্যম’। কবির অক্সিজেনের নল একটু পরে খুলে দেওয়া হল। ধীরে ধীরে কমে আসছিল কবির শরীরের উষ্ণতা। মহর্ষি ভবনের দোতালার একটি ঘরে ১২টা ১০ মিনিটে পুরোপুরি থেমে গেল বিশ্বকবির হৃদস্পন্দন!

প্রকৃতির কোলে শান্তিনিকেতনেই নিজের নশ্বর দেহটার বিলিন চেয়েছিলেন কবি। কিন্তু সে সাধ আর পূরণ হয়নি। কলকাতায় নিমতলা মহাশশ্মানে কবির নিথর শরীর বিলিন হল পঞ্চভুতে। বাইরে তখন উদ্বেল মানুষের ভিড়। চোখের সামনে তারা দেখলেন এক মহাপ্রয়াণের শেষযাত্রা!

** তথ্যসূত্রঃ রবীন্দ্রজীবনকথা’ – প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, সর্বজনের রবীন্দ্রনাথ- অধ্যাপক শুভঙ্কর চক্রবর্তী সম্পাদিত, পৃ.২৩, bengalioneindia – Debojyoti Chakraborty, Prothom Alo, Wikipedia)

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular