জান্নাতুল ফেরদৌস
বিদেশ বিভূঁইয়ে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর গুলোতে মেইড ইন বাংলাদেশ ট্যাগ লাগানো তৈরি পোষাক দেখলে আমাদের মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে এই তৈরি পোষাকের মান সর্বোচ্চ পর্যায়ের নয়। একটা তথ্য জেনে অবাক হবেন যে শুধু অতীতের কোন একটা নির্দিষ্ট সময় নয় বরং মানব ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের কাপড় প্রস্তুত করার দক্ষতা অর্জন করেছিলাম আমরা বাঙালিরা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্টি করা অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে তা আজ বিলুপ্ত। আমি ঢাকাই মসলিনের কথা বলছি।
চৈনিক ব্যবসায়ী ইউআন চ্যাঙ মসলিনকে উপাধি দিয়েছিলেন ভোরের কুয়াশা নামে। এছাড়াও বোনা বাতাস এবং বিস্ময়কর মাকড়সার জাল ইত্যাদি নামেও পরিচিত ছিল আমাদের ঢাকাই মসলিন।মসলিনের শুরুটা হয়েছিল ইরানের মলমল কাপড় থেকে কিন্তু একে উৎকৃষ্টতার শিখরে নিয়ে যায় ভারতীয় উপমহাদেশের বাঙালিরা বিশেষ করে ঢাকার মসলিন কারিগররা। মুঘল আমলের বাংলাদেশ ছিল মসলিন তৈরীর স্বর্ণযুগ। সেই সময় আমাদের ব্যবসা বস্ত্র এবং সম্পদের কারণে বাংলাকে বলা হতো পৃথিবীর বুকে স্বর্গ। ভারতবর্ষে যত মসলিন তৈরি হতো তার মধ্যে ঢাকার মসলিন ছিল গুণে-মানে সর্ব শ্রেষ্ঠ। জনশ্রুতি আছে যে সম্রাট শাহজাহান একবার তার মেয়েকে বকাঝকা করেছিলেন কাপড় না পরে ঘোরাঘুরি করার জন্য। কিন্তু সত্যিটা হলো শাহজাহানের কন্যা সাত স্তরের ঢাকাই মসলিন দিয়ে বানানো পোষাক পরা ছিলো।
ঢাকাই মসলিনের দাম সেই সময়কার সবচেয়ে ভালো মানের সিল্কের কাপড়ের দামের চেয়েও বহু গুণ বেশি ছিল। সর্বোচ্চ মানের মসলিনে প্রতি বর্গ ইঞ্চি কাপড়ে ২০০০ এর বেশি সুতার কাউন্ট থাকতো। মেঘনা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে জন্মানো বিশেষ ধরনের কার্পাস তুলোর গাছ ফুটি কার্পাস থেকে সেই মসলিনের সুতো তৈরি হতো। দিনের বিশেষ সময়ে ভোরে এবং সন্ধ্যায় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ যখন খুবই বেশি থাকত শুধুমাত্র তখনই মসলিনের সর্বোচ্চ মানের সুতো তৈরি করত আমাদের দক্ষ কারিগররা।যে কারণে এখন আর কেউ ঢাকাই মসলিন তৈরি করতে জানে না তা হল ইংরেজরা উদ্দেশ্যমূলক ভাবে এবং চতুরতার সাথে এই অঞ্চলের অর্থনীতি ধ্বংস করার মাধ্যমে মসলিন শিল্পকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিল। তারা নিজেরা মসলিন তৈরি করার কারিগরি কৌশল শিখে নেয় এবং বাঙালি ব্যবসায়ীদের ওপর ৭৫ পার্সেন্ট কর ধার্য করে প্রতিযোগিতা ধ্বংস করে দেয়। এর সাথে যোগ হয় একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মসলিন তৈরির বিশেষ গাছ ফুটি কার্পাস এর বিলুপ্তি। এভাবেই হারিয়ে যায় পৃথিবীর ইতিহাসের সেরা কাপড় তৈরীর সংস্কৃতি — ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে এটা ছিল পরিকল্পিতভাবে একটি সংস্কৃতির বিলোপ সাধন।
রবার্ট ক্লাইভকে বলা হয় বাংলা বিজয়ী সেনাপতি। নিজেকে সে ভারতবর্ষের ক্লাইভ হিসাবে পরিচয় দিত। সেই সময়কার বাংলাকে লুট করার কারণ হিসাবে সে উল্লেখ করে যে এরা এত বেশি সম্পদশালী, ধনবান যে এটাই ওদের ভবিতব্য। লর্ড ক্লাইভ এতটাই হারামি ছিল যে তার সমসাময়িক অন্যান্য ব্রিটিশ সেনাপতিরাও তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত করেছিল। এমনও শোনা যায় যে ব্রিটিশরা দক্ষ মুসলিম কারিগরদের বুড়ো আঙ্গুল কেটে দিত যাতে তাঁত বুনতে না পারে। বাংলাদেশ সেই অর্থনৈতিক ক্ষতি এখনো পুষিয়ে নিতে পারেনি। আমরা বাঙালিরা আমাদের ঐতিহ্য হারিয়েছি। এখনো মসলিন তৈরি হয় কিন্তু তা কোনো অর্থেই সেই স্বর্ণযুগের মসলিনের ধারেকাছেও নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঢাকাই মসলিনের প্রদর্শনীটি এখনো ব্রিটিশ জাদুঘরে অবস্থিত।
** মতামতের জন্য সম্পাদক / প্রকাশক দায়ী নয়
