- বিজ্ঞাপন -
হোম কৃষিভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ

ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ

ইজাজ আহমেদঃ বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিরপাতের ফলে নিচু অঞ্চল পানিতে নিমজ্জিত হয় । এই সময়ে উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং বাংলাদেশের যে সকল এলাকা জলাবদ্ধপ্রবন সে সব এলাকায় ভাসমান পন্থায় চাষাবাদ করা যেতে পারে । স্থানীয় ভাষায় ভাসমান এই পদ্ধতিকে ধাপ বা বেড় পদ্ধতিও বলা হয় । পানির উপরে কচুরিপানা, টেপাপানা, কলাগাছ ও কাঁদা মাটি দিয়ে ধাপে ধাপে বেড় দিয়ে করা হয় বলে স্থানীয় ভাষায় ধাপ বা বেড় পদ্ধতি হিসেবে বেশ জনপ্রিয় । পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষি আবাদকে ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে এফএও (Food and Agriculture Organization). বাংলাদেশের ছয়টি কৃষি পদ্ধতি সম্ভাবনাময় জিআইএএইচএস (Globally Important Agricultural Heritage System) সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে । এর মধ্যে ভাসমান চাষাবাদ পদ্ধতি কৃষি ঐতিহ্য সাইট হিসেবে এফএওর স্বীকৃতি পায় ২০১৬ সালে ।

প্রয়োজনীয় উপকরণ বেড তৈরি পদ্ধতি ও যত্ন

প্রথমে কলাগাছ দিয়ে ৫০-৬০ মিটার (১৫০-১৮০ফুট) দৈর্ঘ ও দেড় মিটার (৫-৬ ফুট) প্রশস্থ এবং ১-৩ ফুট পুরু করে ভাসমান ভেলা তৈরি করতে হবে । তারপর ভেলার উপর পলিথিন শীট বিছিয়ে তার উপর (কচুরিপানা, শ্যাওল্‌ দুলালীলতা, টোপাপানা, কুটিপানা, কলমিলতা, জলজলতা) দিতে হবে । এবার কাঁদা দিয়ে জলজ উদ্ভিগুলো পরু করে ঢেকে দিতে হবে তারপর ভার্মি কম্পোস্ট ব্যাবহার করে বীজতলা অথবা সবজি চাষের আদর্শ বেড হিসেবে উপযুক্ত করতে হবে । বেড তৈরির পর ধাপে জৈব উপকরণ দ্রুত পচাতে ব্যবহার করা হয় সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া সার। এ ধাপ চাষের উপযোগী করতে সাত থেকে ১০ দিন প্রক্রিয়াধীন রাখতে হয়। একটি ধাপের মেয়াদকাল কম বেশি সাধারণত ৩ মাস। ধাপে অঙ্কুরিত চারা পরিপক্ব চারায় পরিণত হয় মাত্র ২০ থেকে ২২ দিনে । যে কারণে পুনরায় ব্যবহার করার জন্য ধাপগুলোর সামান্য পরিবর্তন করতে হয় । এরপর ৫ থেকে ৬ দিন পরপর ভাসমান ধাপের নিচ থেকে টেনে এনে নরম কচুরিপানার মূল বা শ্যাওলা টেনে এনে দৌলার গোড়ায় বিছিয়ে দেওয়া হয় । এতে দৌলাগুলো একে অপরের সাথে গায়ে গায়ে লেগে থাকে, আর জীবনের সঞ্জিবনী শক্তি পায় এখান থেকে । এ যেন পরম মমতায় উদ্ভিদের যান্ত্রিক শক্তি প্রদানের ব্যবস্থা । এরপর শুধু চারাগুলোর বেড়ে উঠার পালা । চারাগুলোর বেড়ে উঠার জন্য করতে হয় নিয়মিত পরিচর্যা আর যত্নআত্তি প্রয়োজন । এর মধ্যে পড়ে প্রতিদিন ধাপে হালকা করে পানি সেচ দেয়া । যাতে করে চারার গোড়া শুকিয়ে না যায়, সজীব থাকে । আর অল্প পরিমাণ ইউরিয়া সার ছিটানো । এভাবে মাসাধিক কাল যত্ন শেষে বিক্রির জন্য তৈরি হয়। বীজতলার মালিকরা অপেক্ষা করেণ মহাজন ফড়িয়ার জন্য ।

সময়কাল

ভাসমান পদ্ধতিটি আষাঢ়-কার্তিক মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসের জন্য অত্যন্ত অর্থকরী ও লাভজনক । এসব অঞ্চলের জমিতে বছরের অগ্রহায়ণ-বৈশাখ মাস পর্যন্ত বোরো ধানের চাষ হয় । এরপর জ্যৈষ্ঠ-অগ্রহায়ণ মাস ৭-৮ মাস পর্যন্ত ৭-৮ ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে এসব জমি । তাই এ সময় এখানকার মানুষ বেকার হয়ে পড়েন। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি । আষাঢ় মাসে কচুরিপানা সংগ্রহ করে স্তূপ করা হয়। জলাভূমিতে প্রথমে কচুরিপানা এবং পর্যায়ক্রমে শ্যাওলা, দুলালীলতা, টোপাপানা, কুটিপানা, কলমিলতা, জলজ লতা স্তরে স্তরে সাজিয়ে ২-৩ ফুট পুরু করে ধাপ বা ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হয় । ধাপ দ্রুত পচানোর জন্যও সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয় । এ ধাপ চাষের উপযোগী করতে ৭-১০ দিন প্রক্রিয়াধীন সময় রাখতে হয় ।

ভাসমান পদ্ধতিতে মসলা ও সবজি চাষ

ভাসমান পদ্ধতিতে মসলা ও সবজি উৎপাদনের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে মাটির পরিবর্তে পানিতেই গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে ভাসমান এই পদ্ধতিতে সারা বছর মসলা ও সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। ভাসমান বেডে মসলা ও সবজি চাষ করে সফল হয়েছেন দেশের অনেক কৃষক । উৎপাদিত সবজি বাজারে বিক্রি করে ইতোমধ্যে অর্থ উপার্জনও করেছেন তারা । এই পদ্ধতিতে সবজি চাষে তেমন বালাইনাশক ব্যাবহার করার প্রয়োজন পরে না কারণ এতে রোগবালাই কম হয় । ভাসমান পদ্ধতিতে মসলা ও সবজি চাষের ক্ষেত্রে সরাসরি বীজ বপন করা সম্ভব হয় না বিধায় কৃষকদের এক ধরনের আধার ( দৌলা/মেদা ) তৈরি করতে হয় । এক মুঠো আধা পচা টোপাপানা বা ছোট কচুরিপানা, দুলালীলতা দিয়ে পচিয়ে বলের মত করে তার মধ্যে নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া দিয়ে আধার তৈরি করা হয় । এই আধারের মধ্যে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে গর্ত করে সবজির পুতে ভেজা যায়গায় বীজ অঙ্কুরিত করে তারপর শুকনো যায়গায় রাখতে হয় । এভাবে গজানো চারাগুলো শুকনো স্থান থেকে নিয়ে ভাসমান বেডে স্থানান্তর করা হয় । এবং একটি অঙ্কুরিত বীজ বীজতলায় রোপণ করার ২০-২২ দিনের মাথায় পূর্ণবয়স্ক চারায় রূপান্তরিত হয় । ১ সপ্তাহের মধ্যে কৃষক বা চারার পাইকারি ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যান এসব চারা । জৈবসারে উৎপাদিত এসব চারার উৎপাদন খরচ পড়ে ১ থেকে দেড় টাকা । ১ হাজার চারা আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয় ।

দৌলা বা মেদা

ভাসমান বা ধাপ পদ্ধতিতে সরাসরি বীজ বপন সম্ভব না হওয়ায় কৃষকরা প্রতিটি বীজের জন্য এক ধরনের আধার তৈরি করেন। তারা এর নাম দিয়েছেন দৌলা বা মেদা । একমুঠো আধা পচা টেপাপানা বা ছোট কচুরিপানা, দুলালীলতা দিয়ে পেচিয়ে বলের মতো করে তার মধ্যে মধ্যে নারিকেল ছোবড়ার গুঁড়া দিয়ে তৈরি করা হয় দৌলা। সাধারণত নারীরা দৌলা তৈরির কাজ করেন । এ দৌলার মধ্যে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে গর্ত করে বিভিন্ন সবজির অঙ্কুরিত বীজ পুঁতে মাচানে বা রাস্তার পাশে শুকনো জায়গায় রাখা হয় । এর আগে ভেজা জায়গায় বীজ অঙ্কুরিত করে নেয়া হয় । দৌলাগুলো এভাবে ৩ থেকে ৭ দিন লাইন করে রাখা হয় । ৭ থেকে ১০ দিন পর গজানো চারাগুলো ভালোভাবে বেরিয়ে আসলে ধাপে স্থানান্তরের কার্যক্রম শুরু হয় এবং ধাপে স্থানান্তর করেন ।

ভাসমান পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি

ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষের ন্যায় ভাসমান বীজতলা তৈরি করা যায় । তবে অবশ্যই শক্ত ভেলা বা বেডের উপর আবর্জনা বা চাটাই দিয়ে বেড সমান করে নিতে হবে । তারপর কমপক্ষে ২-৩ সেন্টিমিটার বা ১ ইঞ্চি পরিমাণ পুকুরের তলার মাটি ভেলার উপর দিয়ে ভাসমান পদ্ধতিতে ভেজা বীজতলা তৈরি করতে হবে । এবং একটি খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে যেন স্রোতে ভেসে না যায় । ভাসমান বীজতলার বিশেষ বিশেষত্ব হচ্ছে বন্যার পানি বাড়লেও বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না । তাই সাধারণত আমন ধানের চারা উৎপাদনে ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হয় । চারা উৎপাদন শেষ হলে বীজতলায় সবজি লাগানো যায় এবং বীজতলা পচে গেলে তা জৈব সার হিসেবে ফসলি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা যায় ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুর ও বরিশালের বানারীপাড়া এলাকায় গড়ে ওঠা ভাসমান পদ্ধতিটি এখন সারা দেশের উপযুক্ত বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় যেখানে জলাবদ্ধতা কিংবা পানির পর্যাপ্ততা রয়েছে, সেখানেই এ পদ্ধতির আবাদ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে ১৭টি জেলায় এ পদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে আবাদ হলেও শিগগিরই এ পদ্ধতিতে আবাদ কার্যক্রম ২৪টি জেলায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে ডিএইর। বর্তমানে এ পদ্ধতির কার্যক্রম ২২টি উপজেলায় চলমান থাকলেও আগামী বছরগুলোয় তা উন্নীত করা হবে ৪৬টি উপজেলায়।

এক পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এরই মধ্যে রাঙ্গামাটি ও কাপ্তাই লেককে এ পদ্ধতিতে চাষের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যেই গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, বরিশালের অন্যান্য এলাকা ছাড়াও সুনামগঞ্জের হাওড়, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মাদারীপুর, কুমিল্লা, চাঁদপুর, মানিকগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও রাঙ্গামাটির লেকগুলোকে এ চাষের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

প্রিয় পাঠক,আপনিও গ্রামীণ কৃষির অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল বিষয়ক ফ্যাশন,স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন  grameenkrishi2016@gmail.com - এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular