গ্রামীণ কৃষি ডেস্কঃ ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ শহীদ হয়েছিলেন ‘সার্জেন্ট জহুরুল হক’। ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যদের বিচার’ অথবা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা হিসেবে অধিক পরিচিত মামলাটির অভিযুক্তদের মাঝে ১৭ তম ছিলেন তিনি। ১৯৩৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানার সোনাপুর গ্রামে জন্মেছিলেন, বাংলা ও বাঙালীর অন্যতম বীর সার্জেন্ট জহুরুল হক। তিনি ১৯৫৩ সালে নোয়াখালী জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৫৬ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন শেষে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। বিমানবাহিনীতে তিনি ‘সার্জেন্ট’ পদে উন্নীত হয়েছিলেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বন্দী থাকা অবস্থায় তাঁর প্রতিবাদের ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় তাঁকে ‘অসামান্য মানবিক বীর’ হিসেবেই চিহ্নিত করবে নিঃসন্দেহে। এ প্রতিবাদই মূলত তাঁর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছিল।
১৪ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ১৯৬৯ সালের ঘটনার দুটি বিবরণ পাই আমরা, আগরতলা মামলার আসামীদের অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করতো আইয়ুব জান্তা। ক্ষুধা মেটাবার জন্য যেটুকু সম্ভব খেয়ে বাকীটা কাঁটাতারের অন্যপাশে অপেক্ষমাণ অভুক্ত শিশুদের দিয়ে দিতেন। প্রতি সন্ধ্যায় ক্যান্টমেন্টে সৈনিকদের খাবারের উচ্ছিষ্ট সংগ্রহের জন্য বাঙালি শিশুরা ভিড় করতো। সেদিন অবাঙালি সৈনিকেরা কয়েকজন অভুক্ত শিশুকে ধরে এনে বন্দী শিবিরের সামনে নির্মম প্রহার শুরু করে। আটক বন্দীরা এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানালে, পশ্চিম পাকিস্তানী হাবিলদার, ‘মনজুর শাহ’ বন্দীদের নিজ নিজ কামরায় ফিরে যেতে আদেশ করে। সার্জেন্ট জহুরুল হক মনজুর’কে উপেক্ষা করে এই নির্মমতার প্রতিবাদ করেন। মনজুর শাহ ক্ষিপ্ত হয়ে রাইফেলে বেয়োনেট লাগিয়ে তাঁর দিকে ছুটে যায়। কিন্তু সার্জেন্ট জহুরুল হক, মনজুরের হাত থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নেন এবং নিজ কামরার দরজায় গিয়ে রাইফেল ফেরত দেন। পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি শনিবার, ১৯৬৯ সাল। শহীদ সার্জেন্টের ভ্রাতুস্পুত্রী ‘নাজনীন হক মিমি’ তাঁর রচিত ‘৬৯-এর শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক ও মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘এদিন সকালে মনজুর সেই রাইফেলটি দিয়েই বন্দী সার্জেন্ট জহুরুল হক’কে গুলি করে। তাঁর গুলিবিদ্ধ পেটের ওপর উঠে দাঁড়ায়। রাইফেলের মাথার বেয়নেট দিয়ে সরাসরি পেটের মধ্যে আঘাত করে। বেয়োনেটের আঘাতে জহুরের পেটের সমস্ত তন্ত্রী ছিড়ে যাচ্ছে। তবুও বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যটি ক্ষান্ত হচ্ছে না। তাঁকে জুতা দিয়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে। বুটের আঘাতে জহুরের কলার বোন ভেঙ্গে যায়…।’ সার্জেন্ট জহুরুল হক, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এদিন রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে মারা যান। উল্লেখিত গ্রন্থে, হাসপাতালে উপস্থিত ডাঃ কর্নেল এম. এ. আলীর বর্ণনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, সার্জেন্ট জহুরুল হকের চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল। স্বাধীনতা এত সস্তা নয়, নয় এত ঠুনকো। ত্রিশ লক্ষাধিক শহীদের রক্ত মিশে আছে বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি জমিনে। যে জমিনে পা রাখছেন, খেলছেন, আত্মঅহমে দাবড়ে বেড়াচ্ছেন, সেই জমিনের মতো পবিত্র কোন ভূখণ্ড এই পৃথিবীতে নাই। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকারী শহীদদের যেন ভুলে না যাই আমরা। ইতিহাস বিস্মৃত ও বিচ্যুত জাতি কখনোই মহান নয়, মহৎ নয়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় স্মরণ করছি, ‘মানবিক বীর’ শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক’কে। পরম করুনাময় এই অসামান্য কোমল হৃদয়ের মানুষকে সম্মানের সাথে চিরশান্তির স্থানে আসীন করুন।
[তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ ‘৬৯-এর শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক ও মুক্তিযুদ্ধ’ – নাজনীন হক মিমি। গ্রন্থটির লেখক শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের ভ্রাতুস্পুত্রী।]
