রাণী ভবানী জন্ম গ্রহণ করেন ১৭১৬ সালে ছাতিয়ান গ্রাম, আদমিদঘি, বগুড়া ,সুবাহ বাংলা। ১৭৩০ সালে, তৎকালীন নাটোরের জমিদার বাবু রামকান্তের সাথে ভবানীর বিয়ে হয়। তাঁর তিনটি সন্তান হয়, দুই পুত্র ও এক কন্যা। কিন্ত দুই পুত্র অল্প বয়সেই মারা যায় । শুধুমাত্র কন্যা যার নাম তারাসুন্দরী, জীবিত ছিলেন। পরবর্তীকালে রাণী একটি ছেলেকে দত্তক নিয়ে নাম রাখেন ‘রামকৃষ্ণ ‘ ।
১৭৪৮ সালে, রামকান্তের মৃত্যু হয় । রামকান্তের মৃত্যুর পর তৎকালীন নবাব, নবাব আলিবর্দি খাঁ –রাজা রামকান্তের স্ত্রী রাণী ভবানীর উপর জমিদারী পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তখনকার দিনে জমিদার হিসাবে একজন মহিলা অত্যন্ত বিরল ঘটনা ছিল ।কিন্ত রাণী ভবানী ওই বিশাল জমিদারী কার্য অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নির্বাহ করেন।
রাণীর শেষ জীবনে তখনকার নাটোর রাজ্যের অধীন ভূমির পরিমান ছিল ১২ ( বার ) হাজার বর্গ মাইলের ও অধিক। মোট ১৩৯ পরগনার ১৭,৪১,৯৮৭ টাকা নবাবের রাজস্ব ধার্য ছিল। ইংরেজ সাহেব হলওয়েল এর ধারনা অনুযায়ী জমিদারী এস্টেট এর বার্ষিক খাজনা ছিল সাত লক্ষ টাকা এবং বার্ষিক অর্জিত রাজস্ব ছিল প্রায় পনের লক্ষ টাকা। রাণী ভবানী বিশাল জমিদারীর মালিক হয়েও থাকতেন সাধারণ বিধবার বেশে। তাই তো তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের ” মহারাণী ” ।
১৭৮৬ সাল পর্যন্ত নাটোর রাজ্য ছিল ভারতবর্ষের মধ্যে বৃহত্তম জমিদারী। তাঁর রাজত্বকালে জমিদারী ছিল বর্তমান বাংলাদেশের — নাটোর, রাজশাহী,পাবনা , বগুড়া,কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর, এবং বর্তমান ভারতের মুর্শিদাবাদ, মালদহ, বীরভূম পর্যন্ত বিস্তৃত। এজন্য তাঁকে অরধবঙ্গেশ্বর বলা হত। প্রজা সাধারণের কল্যাণের জন্য রাণী সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর দক্ষতার সাথে বিশাল জমিদারী পরিচালনা করেন।
রাণী তাঁর অনাড়ম্বর ব্যক্তিগত জীবনযাপন করার সাথে সাথেই তাঁর উদারতা এবং সমহিতৈষী মনোভাব তাঁকে সাধারণ জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করে ।তিনি বাংলায় শত শত মন্দির, অতিথিশালা এবং রাস্তা নির্মাণ করেন। পানীয় জলের কষ্ট দুর করেন। রাণী শিক্ষা বিস্তারেও বিশেষ আগ্রহী ছিলেন ও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদারভাবে অর্থ সাহায্য করেন। ১৭৫৩ সালে কাশি অর্থাত বেনারসে ভবানীশ্বর শিব ও দূর্গা মন্দির, দূর্গাকুন্ড, কুরুক্ষেত্রতলা নামক জলাশয় স্থাপন করেন। রাণী ভবানী তারাপীঠ ও ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সংস্কার করেন। হাওড়া থেকে বেনারস পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন, যা রাণী ভবানী রোড নামে খ্যাত ছিল। উত্তর বঙ্গের রেল যোগাযোগেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল।
দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে রাণী , বাল্যবিধবা কন্যাসহ মুর্শিদাবাদ চলে আসেন ও বড়নগরে বসবাস শুরু করেন। রাণী চলে আসার পর ওয়ারেন হেস্টিংস বল প্রয়োগ করে নাটোর জমিদারী কেড়ে নেয়।
মুর্শিদাবাদে তাঁর নির্মিত একশতটি শিব মন্দির ছিল, কালের প্রবাহে অল্প কয়েকটি টিকে আছে। রাণীর পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে জগদিন্দ্রনাথ ছিলেন স্বনামধন্য রাজা। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র যোগিন্দ্রনাথ রাজা হন। কিন্ত তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন ও বসবাস শুরু করেন ।
যোগিন্দ্রনাথের দুই পুত্রের কোন সন্তান না থাকার ফলে নাটোর রাজবংশের পরিসমাপ্তি ঘটে। মহারাণী ভবানী ১৮০২ সালের ৫ ই সেপ্টেম্বর ৮৬ বছর বয়সে নাটোরে পরলোক গমন করেন। রেখে যান অগণিত মহান কীর্তি।
