বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন -
হোম ইতিহাস ও ঐতিহ্যবৈমানিক সৈয়দা কানিজ ফাতেমা

বৈমানিক সৈয়দা কানিজ ফাতেমা

এম ইকরাম উদ্দিনঃ ডাকনাম তিত্‌লী। যার অর্থ প্রজাপতি। ভাল নাম রোকসানা। সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা। প্রিয়জনদের কাছে ‘লিটল আপা’। জন্মেছিলেন ১৯৫৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী। সাধারণ বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। কিন্তু এই মেয়ের রক্তে ছিল আকাশে ওড়ার নেশা-অসম্ভবকে জয় করার দুর্নিবার বাসনা। শৈশবের তিতলী নামের অর্থ খুঁজতেই যেন জার্মান ভাষার ডিপ্লোমাধারী এই মেয়ে পূর্ব জার্মানির মেডিকেলের স্কলারশিপ ফিরিয়ে দিলেন। রেডিও-টিভির নন্দিত এই শিল্পী ভর্তি হলেন ইডেন কলেজে। পড়ছেন বিএসসিতে, অন্তরে অন্য বাসনা। ১৯৭৬ সালে খুঁজে বের করলেন বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাব। যোগ দিলেন সেই ক্লাবে। ১৯৭৮ সালে পেয়ে গেলেন কমার্শিয়াল বিমান চালানোর লাইসেন্স। সেই সাথে পেলেন সহ-প্রশিক্ষকের লাইসেন্স। বহু শিক্ষানবীশকে ‘সেসনা’ ও ‘উইজিয়ন’ প্লেন চালানো শেখালেন।

যে সময়ের কথা বলছি, তখন বাংলাদেশ বিমানের ককপিটে কোন নারীকে দেখা তো দূরের কথা, কেউ কল্পনাও করতে পারত না। এই তরুণী হাঁটছিলেন সময়ের আগে আগে। তাঁর সামনে দুটো পথ খোলা ছিলঃ এক. ইতিহাসের পুরাতন পথে হাঁটা এবং দুই. নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করা। তিনি দ্বিতীয়টাই বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর অনন্যসাধারণ প্রতিভা ও ব্যক্তিত্ব তাঁকে এ কাজে শক্তি জুগিয়েছিল।

১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ বিমান পাইলট নিয়োগের বিজ্ঞাপন দিলে ক্যাপ্টেন রোকসানাও সেই পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিমান তাঁর নিযুক্তি নিয়ে নানা টালবাহানা শুরু করে। প্রথমে তাঁকে একটি গ্রাউন্ড জব অফার করে। ক্যাপ্টেন রোকসানা সে অফার প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে ২৫ মে ১৯৭৯ তারিখে বাংলাদেশ বিমান পুনরায় সংশোধিত নিয়োগ-বিজ্ঞপ্তি দেয় এই বলে যে, ‘কেবলমাত্র পুরুষেরা আবেদন করিতে পারিবেন।’

এই অন্যায় শর্তের প্রতিবাদে ক্যাপ্টেন রোকসানা ৩১ মে ১৯৭৯ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ‘বাংলাদেশ বিমান বনাম মহিলা বৈমানিক’ শিরোনামে একটি চাঞ্চল্যকর চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন, ‘মহিলা হিসাবে আমি একবিন্দু সুবিধা চাই না বা কোটার সমর্থকও আমি নই, যদি আমি পুরুষের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারি, তবে শুধু মেয়ে হইয়া জন্ম নেওয়ার জন্য আমাকে যেন আমার ন্যায্য অধিকার হইতে বঞ্চিত করা না হয়।’

এই চিঠি সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। জাতীয় সংসদের নারী সদস্যগণ সংবিধানের ২৯ (১) অনুচ্ছেদের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যেখানে লেখা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ ও পদ লাভের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান সুযোগ লাভ করবে।’ অবশেষে সরকারের হস্তক্ষেপে বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ তাদের বিজ্ঞাপন থেকে বৈষম্যমূলক শর্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সকল স্তরে শ্রেষ্টত্ব দেখিয়ে ক্যাপ্টেন রোকসানা ১৯৭৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মুসলিম বিশ্বের প্রথম মহিলা পাইলট হিসাবে নিয়োগপত্র লাভ করেন। সর্বজনের শ্রদ্ধায় ভালবাসায় তিনি হয়ে ওঠেন এক বৈজয়ন্তী বৈমানিক।

১৯৮৪ সালের ৫ই অগাস্ট তিনি ঢাকার উপকণ্ঠে এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে ‘রোকসানা ফাউন্ডেশন’ এর উদ্যোগে ১৯৮৫ সালের জুলাই থেকে ‘মাসিক রোকসানা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে।আজ সেই পরিবারের অনেকেই বেঁচে নেই। বাবা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, মা আলহাজ্জ সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, ভাই সৈয়দ রুমী ওয়ালিউল্লাহ, ইতোমধ্যেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন না-ফেরার দেশে।

প্রিয় পাঠক,আপনিও গ্রামীণ কৃষির অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল বিষয়ক ফ্যাশন,স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন  grameenkrishi2016@gmail.com - এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular