মোহাম্মদ সাইকুল ইসলাম
রাশিয়ার কাজান শহরের বৃহত্তম মসজিদ কুল শরীফ মসজিদ। দুই তলা বিশিষ্ট মধ্যযুগে নির্মিত এই মসজিদের প্রথম তলায় নামাজ ও ইবাদত বন্দেগী করা হয় এবং দ্বিতীয় তলায় একটি ইসলামী মিউজিয়াম রয়েছে। এটি মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শনের একটি মসজিদ।Kul-Sharif Mosque, Kazan, Russia মূলত, মসজিদটি ১৬শো শতাব্দীতে কাজান শহরের ক্রেমলিনে নির্মিত হয়েছিল। কুল শরীফের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল কুল শরীফ মসজিদ। কুল শরীফ নামক এক ব্যক্তি সেখানে কর্মরত একজন ধর্মীয় পন্ডিত ছিলেন। ১৫৫২ সালে কাজানকে রাশিয়ান বাহিনী থেকে রক্ষা করার সময় কুল শরীফ তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থীর সাথে যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন। ধারণা করা হয় এই বিল্ডিংটিতে কাপোলাস এবং তাঁবু উভয়ের মিনারই রয়েছে। রাশিয়ার সর্ববৃহৎ নদী ভলগা। একই সাথে পুরো ইউরোপেরও। ৩ হাজার ৫৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী ছুঁয়ে গেছে কাজান, সামারা ও নিজনি নভগোরদ শহরকে। কাজানের এবং সামারার বেশ কাছ দিয়ে বয়ে গেছে এই ভলগা নদী।কাজানে এই ভলগা নদীর তীরেই অবস্থিত কুল শরীফ মসজিদ। রাশিয়ার অন্যতম মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ তাতারস্তানের রাজধানী কাজান। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই দেশের অন্য দুই মুসলিম প্রদেশ হলো চেচনিয়া ও দাগেস্তান। তাতারস্তানের জনগোষ্ঠির ৬০ ভাগ মুসলিম।

অনেক মসিজদ রয়েছে কাজানসহ পুরো তাতারস্তানে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও দৃষ্টি নন্দন স্থাপত্যের নিদর্শণ হলো কুল শরীফ মসজিদ। গাঢ় নীল রঙের এই মসজিদের বিশাল গুম্বুজ ও চারটি সু-উচ্চ মিনার চোখে পড়ে বহু দূর থেকে। রাতে যখন আলো জ্বলে উঠে এই মিনার ও গুম্বুজে তখন আরো সুন্দর লাগে এই মসজিদকে। চারদিক থেকে কুল শরীফ মসজিদটিকে দেখে চোখ জুড়ায়।সকাল নয়টা থেকে বিকেল সাতটা পর্যন্ত খোলা থাকে এই মসজিদ। এই মসজিদে দিনে দুই বেলা নামাজ হয়। যোহর ও আসর। বাকী সময়ে বন্ধ থাকে এই ইবাদত ঘর। তবে এই মসজিদে নিয়মিত জুমার নামাজ আদায় করেন স্থানীয় মুসলিমরা। ঈদের নামাজও হয়। তখন মুসলিমদের ঢল নামে এই কুল শরীফ মসজিদে। নামাজের সময় ছাড়া বাকী সময়ে বন্ধ থাকে এই মসজিদের দরজা। না রেখে উপায়ও নেই। গ্রীষ্মকালে দর্শনার্থীরা বিশেষ করে মহিলারা স্বল্প পোশাকে ঘুরতে এসে এই মসজিদে ঢুকে ছবি তুলতে ভালবাসেন।এই কুল শরীফ মসজিদের পুরো মসজিদ চত্তরকে বলা হয় কাজান ক্রেমলিন। মসজিদের ১ শত গজ দূরেই অবস্থান বিশাল এক গির্জার। নাম ব্লাগোভিশানস্কি চার্চ। মুসলিম ও খৃষ্টান এই দুই ধর্মের মানুষদের মধ্যে সম্প্রতির বন্ধন বিদ্যমান বুঝাতেই পাশাপাশি মসজিদ ও গির্জার অবস্থান। খ্রিস্টান প্রধান দেশটিতে তাতার মুসলিমরা বেশ শান্তিতে আছেন। কোনো সমস্যা নেই। অনুপস্থিত ধর্মীয় উত্তেজনাও। পাশেই অবস্থান সুইউমবিকে টাওয়ারের। পুরোনো এই টাওয়ারকে ঘিরে আছে এক ভালোবাসার কাহিনী। সাত দিনের মধ্যে টাওয়ার নির্মাণ করতে পারলে তাকে বিয়ে করতে রাজী হবেন এক মহিলা। এই শর্ত দেয়া হয় স্থানীয় অধিপতিকে। নির্ধারিত সময়ের আগে ঠিকই টাওয়ার নির্মাণ শেষ করেছিলেন ওই অধিপতি। কিন্তু এরপরই তার বোধদয় হয়- ওই মহিলাতো আমাকে পছন্দ করেনি, করেছে টাওয়ারকে। তাই পরে তিনি আত্মহত্যা করেন।স্থানীয় মুসলিমদের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার কমিউনিস্ট শাসন আমলে অন্য সব এলাকার মতো তাতারস্তানেও বহু মসজিদ ধবংস করা হয়েছিল। কিন্তু হাত দেয়া হয়নি এই কুল শরীফ মসজিদে। ধর্মবিদ্বেষী কমিউনিস্টরা অবশ্য বহু গির্জাও ধ্বংস করেছিল।১৫৫২ সালে কাজান আক্রান্ত হলে তখন কাজান রক্ষায় যুদ্ধে নামেন ইমাম কুল ও তার ছাত্ররা। সেই যুদ্ধে মারা যান ইমাম কুল। মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছিলেন ইমাম কুল। তাকে সহই পুড়িয়ে ফেলা হয় মসজিদটি। ২০০৫ সালে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের আর্থিক সহযোগিতায় নতুন করে নির্মিত হয় আজকের এই আধুনিক ও চমৎকার মসজিদ। নামও দেয়া হয় তার নামে কুল শরীফ মসজিদ।

কাজানে আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এই মসজিদ। মসজিদটির ছবি সম্বলিত কার্ডও বিক্রি হয় আশেপাশে। পর্যটনের প্রচারণায় আছে এই মসজিদের ছবি। তবে খারাপ লাগার বিষয় হল স্বল্প পোশাকের নারী পর্যটকরা এসে এই মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের ক্যামেরাবন্দী করেন সর্বদা। এজন্য এখানে পর্যটকদের ভীড় লেগে থাকে। অন্য ধর্মাবলম্বী ছাড়াও স্থানীয় তাতার মুসলিম মেয়েদেরও ছোট পোশাকে মসজিদের পাশে ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায়। আবার হিজাব পরেও অনেক মেয়েরা এসে এখানে ভ্রমণ করেন।বিশাল এলাকা জুড়ে এই মসজিদ চত্তর অবস্থিত। চারপাশে দেয়াল ঘেরা। বেশ উঁচুতে অবস্থান এই মসজিদের। ঘুরে ঘুরে মাটির উপর নির্মিত সিড়ি ডিঙিয়ে যেতে হয় মসজিদে। পাশেই থাকা ভলগা নদীর বাতাসে পর্যটকদের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তিন চারটি গেট দিয়ে প্রবেশ করা যায় কুল শরীফ মসজিদে। মসজিদ চত্তরে উঠে পুরো এলাকা চমৎকার দৃষ্টিগোচর হয়। মসজিদ লাগোয়া আরো কিছু ভবন আছে। তা প্রশাসনিক ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। পানি সংরক্ষণ এবং অগ্নি নির্বাপনের জন্য যে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে তাও মসজিদের গম্বুজের রঙে। সব মিলে এক অসাধারণ পরিবেশ।কাজানকে বলা হয় রাশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম নগরী। সেই সাথে তৃতীয় রাজধানীও। নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেলাধুলার জন্য বিখ্যাত এই শহর। নামকরা অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবস্থিত এখানে। জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেশ কম।রুশদের সাথে আলাদা অবস্থানে গিয়ে তাতার মুসলমানরা ক্রমশ নিজেদের এলাকার বিভিন্ন মসজিদ উন্নত করেছেন। সব মিলে কাজান মুসলিম ঐতিহ্যের অনন্য এক নগরী। ১৫৫২ সালে কাজান অবরোধের সময় এই কুল মসজিদটি ইভান দ্য টেরিয়ার্স দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছিল।মসজিদটি মোজাইক, অলঙ্কার, ক্যালিগ্রাফি এবং আরও অনেক কিছুর মাধ্যমে বেশ কয়েকটি বিশদ সৌন্দর্য প্রদর্শন করে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কুল শরীফ মসজিদ পুনর্নির্মাণের জন্য যে তহবিল গঠন করা হয়েছিল তাতে বেশ কয়েকটি দেশ অবদান রেখেছিল। আজকাল কুল শরীফ মসজিদটি প্রধানত ইসলামের যাদুঘর হিসাবে কাজ করে। একই সাথে মুসলিমদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের সময় হাজার হাজার লোক সেখানে নামাজ পড়তে জড়ো হয়।কুল শরীফ কমপ্লেক্সটি কাজানের আর্কিটেকচারাল ল্যান্ডস্কেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মূল মসজিদ ভবন ছাড়াও এটিতে একটি গ্রন্থাগার, প্রকাশনা এবং ইমামের কার্যালয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
