সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ
প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিনটিকেই এই দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায়—খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার, এটি কোনো বিলাসিতা নয়।
২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য—“খাদ্য নিরাপত্তায় স্মার্ট কৃষি, টেকসই পৃথিবীর অঙ্গীকার”—বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও খাদ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে একেবারে সময়োপযোগী।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই প্রতিপাদ্যের গুরুত্ব আরও গভীর।
কারণ, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রায় ১৩ শতাংশ জিডিপি কৃষি খাত থেকে আসে, এবং কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। কৃষিই আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ আশ্চর্য সাফল্য অর্জন করেছে।
১৯৭১ সালে যেখানে দেশের খাদ্য উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি টন, এখন তা বেড়ে ৪ কোটি টনেরও বেশি।
আমরা আজ ধান, সবজি, মাছ ও পোলট্রি উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে।
এটি সম্ভব হয়েছে কৃষকের পরিশ্রম, কৃষি গবেষণার অগ্রগতি এবং সরকারের সময়োপযোগী নীতিমালার কারণে।

তবে এখন চ্যালেঞ্জের ধরন বদলে গেছে।
খাদ্যের পরিমাণের পাশাপাশি পুষ্টি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় লক্ষ্য।
বর্তমানে দেশে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে, এবং খাদ্য অপচয় বছরে প্রায় ৫৫ লাখ টন—এই বাস্তবতাগুলো আমাদের ভাবায়।
তাই টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার জন্য এখন প্রয়োজন-
বিষমুক্ত কৃষি ও জৈব উৎপাদন,
পানি ও মাটির সুষম ব্যবহার,
ডিজিটাল কৃষি ও স্মার্ট প্রযুক্তির প্রয়োগ,
এবং খাদ্য অপচয় হ্রাসে সামাজিক সচেতনতা।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ক্লাইমেট-স্মার্ট কৃষি, ড্রোন ও সেন্সর-ভিত্তিক চাষাবাদ, ছাদ কৃষি, এবং শহুরে কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের “এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি থাকবে না” উদ্যোগ, খাদ্য মজুত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, এবং পুষ্টি বৈচিত্র্য কর্মসূচি—এসবই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিচ্ছে।
তবে শুধু সরকার নয়, আমাদের প্রত্যেককেই দায়িত্ব নিতে হবে—
নিজের ঘরে, ছাদে বা ছোট জায়গায় হলেও কিছু চাষ করা; খাদ্য অপচয় রোধ করা; এবং নিরাপদ, স্থানীয় খাদ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
খাদ্য নিরাপত্তা মানে শুধু পেট ভরা নয়—এটি সুস্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও জাতির উন্নয়নের শিকড়।
স্মার্ট কৃষি, পুষ্টিকর খাদ্য ও সঠিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিন “ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ”-এর লক্ষ্য অর্জন করবে—এই প্রত্যাশায় বিশ্ব খাদ্য দিবসের অঙ্গীকার হোক সবার।
লেখকঃ কেন্দ্রীয় সভাপতি - বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
কৃষি লেখক ও কথক - বাংলাদেশ বেতার
উপদেষ্টা - দৈনিক গ্রামীণ কৃষি
সাধারণ সম্পাদক - আমরা পল্লবী বাসী,ঢাকা।
