ইজাজ আহমেদঃ বৃক্ষ মানুষের পরম বন্ধু। মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উপাদান অক্সিজেনের যোগানদাতা গাছ এবং সেই সাথে পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখতে গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বৃক্ষ নিধন করে তৈরি হচ্ছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কলকারখানা। যার ফলস্বরূপ, পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের পানি ফুলে উঠছে এবং নিচু অঞ্চলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। অতএব, এখন থেকে আমাদের বৃক্ষরোপণের প্রতি
মনোযোগ দিতে হবে কারণ এইভাবে চলতে থাকলে পৃথিবী এক সময় বসবাসের জন্য অনুপযোগী হয়ে যাবে। তাই চলুন সকলে মিলে বৃক্ষরোপণের নতুন অঙ্গীকার গ্রহণ করি।
বৃক্ষরোপণ বিষয়ক প্রাসঙ্গিক তথ্যঃ
প্রথমত আমাদের স্থান উপযোগিতার ভিত্তিতে গাছ লাগাতে হবে। যেমন, বেশি পানি সহ্য করতে পারেনা এমন প্রজাতি পানির ধারে লাগানো যাবে না। এবং পুকুর পাড়ে পাতাঝড়া বৃক্ষ না লাগানোই ভালো ও ইলেক্ট্রিক তারের নিচে বা কাছে বেশি লম্বা হয় ও ডালপালা ছড়ায় এমন গাছ লাগানো যাবে না। বড় এলাকার জুড়ে এক প্রজাতির বাগান না করে বহু প্রজাতির মিশ্রণে বাগান করতে হবে কারণ জাতভেদে গাছের পুষ্টিগুণ ভিন্ন এবং সঠিক সময়ে বাগানের গাছ পাতলা করতে হবে। ডাল-পালা ছাটাই করে গাছের গড়ল ঠিক রাখতে হবে। রোগ-বালাই, গরু-ছাগলের হাত থেকে চারা ও পূর্ণবয়স্ক গাছকে রক্ষা করতে হবে। জ্বালানী কাঠের জন্য ইউক্যালিপটাস, ইপিল-ইপিল, গ্লিরিসিডিয়া ইত্যাদি গাছ ৪-৫ বছর পর পর কেঁটে আহরণ করতে হবে এবং কর্তিত গাছের মোথা থেকে নতুন কুশি বা কপিস বের হয়ে নতুন কান্ডে রুপান্তরিত হবে। এভাবে ৪-৫ বছর আবর্তে কপিস ব্যবস্থাপনার
মাধ্যমে একাধিকবার জ্বালানী কাঠ আহরণ করা যাবে।
কোথায় কি গাছ লাগাতে হবে। স্থান ও গাছের বৈশিষ্ঠ্য বিবেচনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রোপণ উপযোগী গাছের নাম নিম্নে দেওয়া হলোঃ
বসতবাড়ীর আশেপাশে রোপণ উপযোগী গাছেঃ
নিম, আম, জাম, কাঁঠাল, জাম্বুরা, জলপাই, বেলম্বু, কামরাঙ্গা, পেয়ারা, বেল, আমড়া, নারিকেল, তাল, খেজুর, লটকন, কাউ, সজিনা, বকফুল, সুপারি, লিচু, ডালিম, কুল, লেবু, তেজপাতা, দারুচিনি, বিলাতিগাব, সফেদা, কলা, পেঁপে, তুন, শিলকড়ই, গামার, অড়হর, বাসক, পাথরকুচি, বাঁশ ইত্যাদি। বর্ষার পানি জমে এমন যায়গায় কদম, জারুল, পিটালী, বরুন, জাম ইত্যাদি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গনে রোপন উপযোগী গাছঃ
নারিকেল, তাল, কাঠবাদাম, আম, জাম, কাঠাল, পেয়ারা, জাম্বুরা, গাব, লিচু, কাউ, চম্পা, মেহগনি, তেলসুর, জারুল, সোনালু, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, কামিনি, বকুল, অশোক, নাগেশ্বর, উইপিং দেবদারু, দেবদারু, বটল-ব্রাশ, বটল-পাম, অরোকেরিয়া, থুজা ইত্যাদি।
শিল্প অঞ্চলে রোপণ উপযোগী গাছঃ
মেহগনি, নিম, নারিকেল, তাল, বকুল, নাগেশ্বর, দেবদারু, গাব, উইপিং দেবদারু, রাজকড়ই, পলাশ,কৃষ্ণচূড়া, থুজা, অরোকেরিয়া ইত্যাদি।
হাট-বাজারে রোপণ উপযোগী গাছঃ
বট, অশ্বথ, তেঁতুল, মেহগনি, কাঠবাদাম, রেইনট্রি ইত্যাদি।
কবরস্থান ও শ্মশানে রোপণ উপযোগী গাছঃ
বকুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, শিমুল, দেশিগাব, অশ্বথ, চম্পা, ঝাউ, বটল-ব্রাশ, বটল-পাম, অরোকেরিয়া, সোনালু, পাতাবাহার, রঙ্গন, থুজা, কামিনী ইত্যাদি।
ক্ষেতের আইলে রোপণ উপযোগী গাছঃ
তাল, খেজুর, সুপারি, বাবলা, খয়ের, বকাইন, বকফুল, ধৈঞ্চা, মান্দার, জিগা, কড়ই, ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি।
পুকুর পাড়ে রোপণ উপযোগী গাছঃ
নারিকেল, তাল, সুপারি, খেজুর, পেয়ারা, জাম্বুরা, লেবু, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি।
নদীর বক্ষে জেগে উঠা নতুন চরে রোপণ উপযোগী গাছঃ
ঝাউ, লোনা-ঝাউ, পিটালী, করচ, পানিবিয়াস ইত্যাদি।
উপকূলীয় নতুন চরে রোপণ উপযোগী গাছঃ
কেওড়া, বাইন, কাকড়া, গরান, গোলপাতা ইত্যাদি।
উপকূলীয় এলাকায় জেগে উঠা উঁচু চর (যেখানে ম্যানগ্রোভ জন্মে না):
বাবলা, ঝাউ, সনবলই, সাদাকড়ই, কালাকড়ই, জারুল, রেইনট্রি ইত্যাদি।
রাস্তা ও সড়কের ধারে রোপণ উপযোগী গাছঃ
সড়ক ও মহাসড়ক: রেইনট্রি, রাজকড়ই, শিলকড়ই, কালাকড়ই, বকুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, শিশু, মেহগনি, অর্জুন, দেবদারু, ঝাউ, চিকরাশি, তেলসুর, সোনালু, নিম, লোহাকাঠ, আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি।
ফিডার রোড: শিশু, নিম, দেবদারু, চম্পা, ইপিল-ইপিল, গ্লিরিসিডিয়া, তুন, জাম, জাম্বুরা,
বাবলা, খয়ের, বকফুল, সিন্দুরী, অড়হর, বগামেডুলা, তাল, খেজুর, ইউক্যালিপটাস
ইত্যাদি।
সিটি রোড: দেবদারু, মেহগনি, নিম, চম্পা, নাগেশ্বর, কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, সোনালু, বটল-পাম,
ঝাউ ইত্যাদি
সিটি আইল্যান্ড: উইপিং দেবদারু, বটল-পাম, বটল-ব্রাশ, এরিকা-পাম, কামিনী, চেরী,
জারুল, নাগেশ্বর, সিন্দুরী, জবা, গন্ধরাজ, বাগান বিলাস, মোসেন্ডা, থুজা, অশোক, রাধাচূড়া ইত্যাদি।
রেল লাইন: তাল, খেজুর, বাবলা, খয়ের, বকফুল, সিন্দুরী, বেলা, রাজকড়ই ইত্যাদি।
বাঁধের ধার: তাল, খেজুর, বাবলা, খৈয়া বাবলা, পুনিয়াল, নারিকেল, ঝাউ, জারুল, মান্দার, জাম, কদম ইত্যাদি।
পাহাড়ি বনভূমিতে রোপণ উপযোগী গাছঃ
পাহাড়ের উপরিভাগ: গর্জন, গামার, চম্পা, চিকরাশি, সিভিট, তেলসুর, উড়িআম, আমলকী, পাইন্যাগোলা/লুকলুকি, কনক, ধারমারা, শিলভাদি, গুটগুটিয়া, ঝাউ, আকাশমণি ইত্যাদি।
মধ্যঢাল থেকে পাদদেশ পর্যন্ত: গর্জন, গামার, কালাকড়ই, চাপালিশ, মেহগনি,
শিলকড়ই, সেগুন, তেলসুর, চম্পা, সিভিট, শিমুল, ছাতিয়ান, জারুল, তেঁতুল, ঝাউ, ঢাকিজাম,
পিতরাজ, কাইঞ্জলভাদি, তুন, বট, বকুল, তেতুয়াকড়ই, লোহাকাঠ, চিকরাশি, বাইলাম,
টালি, বান্দরহোলা, তেজবহল, বাজনা, গুটগুটিয়া, উদাল, চালমুগরা, কন্যারী, পাদুকা,
চন্দুল, নারিকেলী, কামদেব, রক্তন, বনাক, ধারমারা, হারগোজা, মুজ, রাতা, উড়িআম,
রাবার, কাঁঠাল, লেবু, বেল, পেয়ারা, বর্তা, কাউ, গাব, কালজাম, হরিতকি, আমলকি, বহেরা,
ওলটকম্বল, অর্জুন, বাঁশ, বেত ইত্যাদি।
পাহাড়ি এলাকার নিচু ভূমি (যেখানে বছরের কোন না কোন সময় পানি থাকে): পুতিজাম,
ডেপামাজ, কালজাম, পিটালী, ডুমুর, শিমুল, চাকুয়াকড়ই, কালাকড়ই, বান্দরহোলা, মান্দার,
হিজল, বট, অশ্বথ, জিগা, কাঞ্চন, বারিয়ালা, বাঁশ, বেত, কারুল, কদম ইত্যাদি।

