শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন -
হোম সাহিত্যবাংলা সাহিত্যের বরপুত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়; সাহিত্যের বিশাল জগতে সুনীল আকাশের মতো শোভা মেলেছেন, আলো ছড়িয়েছেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ খ্রীস্টাব্দে ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার মাইজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কালীপদ গঙ্গোপাধ্যায় ও মাতার নাম মীরা গঙ্গোপাধ্যায়। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি বাবার চাকরির কারণে বাংলাদেশের মাদারীপুর থেকে কলকাতায় চলে যান। বেড়ে ওঠেন সেখানেই।

১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএ ডিগ্রি নেন। টিকে থাকার সংগ্রামে দীর্ঘদিন ছাত্র পড়িয়ে উপার্জনই ছিল তাঁর একমাত্র আয়ের উৎস। এরপর ১৯৭০ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় সাব-এডিটর হিসেবে সাংবাদিকতার জীবন শুরু হয় এই কথাশিল্পীর। সর্বশেষ তিনি ‘দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৬৭ সালে স্বাতী বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ওই বছরই তাদের একমাত্র সন্তান সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম।দুই বাংলায় রয়েছে তার সমান খ্যাতি। বিচিত্র বিষয়ে দুই হাতে লিখে গেছেন এই প্রথিতযশা বাঙালি সাহিত্যিক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কয়েক দশক ধরে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত। সাহিত্য জগতে যেনো সম্রাটের মতোই তিনি আবির্ভূত হন।

তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে অজস্র স্মরণীয় রচনা উপহার দিয়েছেন। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার জীবনানন্দ-পরবর্তী পর্যায়ের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি কখনো এক বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাননি। নির্দিষ্ট বলয়ে আটকে থাকেননি। দুই শতাধিক গ্রন্থের জনক সুনীল গাঙ্গুলি ‘নীল লোহিত’ কিংবা সনাতন পাঠকের আড়ালে তার নিপুণ কলমের ব্যবহার ঘটিয়েছেন। রাজনৈতিক কলাম মুন্সীয়ানী প্রবন্ধ রচনা করে তিনি বিপুল পাঠক প্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। সুনীল ছিলেন অদম্য, অক্লান্ত আড্ডাবাজ মানুষ।

দুই বাংলার লেখকদের সঙ্গে ছিল তাঁর অভিন্ন সখ্য। তিনি বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষাকে তার হৃদয়ের দুই ভাগে পরিপূর্ণভাবে স্থান দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতি শিল্পসাহিত্যের ওপর ছিল তার গভীর আগ্রহ। বাংলাদেশের তরুণ কবিদের কবিতাও পড়তেন তিনি। সুনীলের বিপুল সৃষ্টিকর্মের একটা অংশজুড়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকরা তার লেখায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

সুনীল ছিলেন খুবই অতিথি পরায়ণ, সৌজন্যপ্রবণ মানুষ। সুনীল যেমন ছিলেন কবিতায় উজ্জ্বল তেমনি ছিলেন গল্পে, উপন্যাসে আলোকিত লেখক। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব; সব্যসাচী লেখকের অভিধায় ভূষিত।শুধু কবি-সাহিত্যিক নয়; প্রেমিক-প্রেমিকারা সুনীলের কবিতার মাধ্যমে তাদের ভাব, প্রেমাবেগ প্রকাশ করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “নীরা” নারী জাতির মধ্যে নানাভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রেমিকরা তাদের প্রেমিকাদের মধ্যে নীরাকে খুঁজে পেয়েছেন।সুনীলের কবিতার মূল্যবান লাইন অনেক সময় গল্পকারদের গল্পের শিরোনাম হয়েছে। ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা থেকে তিনি যেসব কবিতা লিখেছেন সেসব কবিতা তার নিজস্ব জীবন ছাপিয়ে সমকালকে স্পর্শ করেছে।তিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায়ই স্বদেশের মায়ায় ছুটে আসতেন বাংলাদেশে। এখানকার মানুষের ভিড়ে মিশে যেতেন। তার আপন ভুবনে অন্তরঙ্গ আড্ডায় মেতে উঠতেন। বাংলাদেশকে দুচোখ ভরে দেখতেন। ভালোবাসার টানে ফিরে যেতেন শৈশবের সেই গ্রামে।

সুনীল একবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাংলাদেশের মমতামাখা ভুবনে স্থায়ীভাবে থেকে যাবেন। তিনি প্রয়োজনে মৃত্যুকে বেছে নিতে চেয়েছেন কিন্তু বাংলা থেকে নির্বাসিত হতে চাননি। বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতার মাধ্যমে বাঙালি জাতির মনের কথা বলে, মনের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। পাঠককুল নিজের অনুভূতি সুনীলের কবিতায় অনুরিত হতে দেখেন।কীর্তিমান লেখক সুনীল দাপটের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যকে শাসন করেছেন। সমাজের অসঙ্গতি আর মানুষের পশু প্রবৃত্তি দেখে সুনীল বিচলিত হয়েছেন। তাঁর মধ্যে ছিল চির উন্নত তারুণ্য।

তিনি মন ও মননে সব সময় তরুণ ছিলেন বলেই তরুণদের তিনি তার ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। সুনীলের কবিতায় চিত্রিত হয়েছে- মানুষ প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে। রাজনীতিকদের অসততা, দুর্নীতি, ক্ষমতার লড়াই মাঝখানে সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত। মানুষকে ঠকাচ্ছে মানুষ।

মানুষের মধ্যে মিথ্যে স্বপ্ন ছড়িয়ে দিচ্ছে মানুষ। মানুষের কল্যাণের রাজনীতি নেই। অনেকেই মিথ্যে বলে, স্বপ্ন দেখায়; কথা দেয়, কথা রাখে না! ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা থেকে হলেও সুনীলের – “কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কেটে গেলো; কেউ কথা রাখে না! ” শীর্ষক কবিতায় এই সব অনুষঙ্গের ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায়। সুনীলের বিবেচনায় প্রেম মানুষকে সত্যবাদী করে। মিথ্যাচারিতা ভুলিয়ে দেয়। তার কবিতায় ভালোবাসা সত্যবদ্ধ হয়ে ধরা পড়েছে। প্রেমের স্পর্শ সবাইকে পাপমুক্ত করে। তার মধ্যে তেমন কোনো সংকীর্ণতা ছিল না। তিনি মুক্ত মানুষ ছিলেন। সেকারণে তার কবিতা হয়ে উঠেছে কালজয়ী।

২৩ অক্টোবর ২০১২ তারিখে হৃদ্‌যন্ত্রজনিত অসুস্থতার কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে ৪ এপ্রিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতার ‘গণদর্পণ’-কে সস্ত্রীক মরণোত্তর দেহ দান করে যান।

এই শক্তিমান লেখকের চিরপ্রস্থান সাহিত্য অনুরাগী মানুষকে নীল বেদনায় নিমজ্জিত করেছে। তবুও তিনি বেঁচে থাকবেন বিপুল সৃষ্টি সম্ভারের মধ্যে, পাঠকের হৃদয়ে। জানাই গভীর ভালোবাসা আর বিনম্র শ্রদ্ধা।

গ্রামীণ কৃষি/ হারুন-অর-রশীদ

তথ্য সূত্রঃ Source- Ananda bazar,/ Bharotbarta/ Sagor Jaman, muktomancho/ Dainik Purbodesh- Sayed Asaduzzaman Shohan.

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular