- বিজ্ঞাপন -
হোম ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ কমরেড মণি সিংহ

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ কমরেড মণি সিংহ

হারুন-অর-রশীদ

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ এবং গণমানুষের নেতা কমরেড মণি সিংহ। কমরেড মণি সিংহ ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা ও তার অন্যতম স্থপতি। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামী, টঙ্ক আন্দোলনের মহানায়ক, তেভাগা আন্দোলনের কুশীলব মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি ছিলেন এ দেশের তরুণ বিপ্লবীদের কাছে অনুপ্রেরণা ও উজ্জীবনের অফুরান উৎস। ছিলেন মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের সৃজনশীল বৈজ্ঞানিক মতাদর্শে দৃঢ় আস্থাবান একজন সাচ্চা কমিউনিস্ট নেতা।

মুক্তি সংগ্রামের এই কিংবদন্তি নেতার জন্ম হয় ১৯০১ সালের ২৮ জুলাই। নেত্রকোনা পূর্বধলার জমিদারের সন্তান কালীকুমার সিংহ ও সুসং রাজবংশের কন্যা শ্রীমতি সরলা দেবী’র কোল আলোকিত করে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে জন্ম নেন কমরেড মণি সিংহ। জন্মের দুই-তিন বছরের মাথায় তিনি পিতৃহারা হন। আর্থিক সংকটের জন্য কলকাতা থেকে পাড়ি জমান ঢাকা মামা’র বাড়িতে। সেখান থেকে সুসং দুর্গাপুর মাতুল রাজ্যে। মায়ের স্বল্প অংশীদারিত্বে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন সুসং দুর্গাপুরে।

প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় সুসং থেকে; এরপর কলকাতা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে যোগ দেন অনুশীলনে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন ‘অনুশীলনের’ চেতনায় বিশ্বাসী মন, লড়াকু হাজংদের সংগঠিত করার জন্য সুসং থেকে মাইল দশ ক্রোশ দূরের গ্রাম কালিকাবাড়ি/পুর থেকে বন্ধু উপেন সান্যালকে সহচর নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। উঁচু-নিচু জাত-পাতের ব্যবধান হটিয়ে শিক্ষাকে অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়ে স্থাপন করেন বিদ্যালয়। কুসংস্কারের বিরুদ্ধাচারণ করে সেই গ্রামে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেন ।

অনুশীলন দলের উচ্চমার্গীয় নেতা সুরেশ চন্দ্র দে-এর পত্র নিয়ে কালিকাপুর গ্রামে আসেন রুশ বিপ্লবী গোপেন চক্রবর্তী। গোপেন চক্রবর্তী’র যুক্তি-অনুপ্রেরণায় পরিচিত হন মার্কসীয় মতবাদের সঙ্গে গড়ে উঠে সখ্যতা। মার্কস-লেনিনবাদে উজ্জীবিত মণি শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে ছুটে আসেন কলকাতা। সেখানে সখ্যতা গড়ে উঠে কমিউনিজম মতবাদী নেতা কমরেড মোজাফফর সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে। সেখান থেকে মিশন মেটোয়াব্রুজ লালঝাণ্ডার উত্থান ও সফলতা।

কমরেড মণি সিংহ ১৯২৮ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯২৮ সালেই তিনি কলকাতার ধাঙ্গর ধর্মঘট, ১৯২৯ সালে ক্লাইভ জুট মিল, বাংলাদেশের প্রথম সর্বাত্মক পাটকল ও চটকল থর্মঘট এবং গার্ডেনরিচ জাহাজ মেরামত ওয়ার্কশপে বাংলাদেশে প্রথম মে দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত ধর্মঘট আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দেন।

১৯৩০ সাল: চট্টগ্রামে মাস্টার দা সূর্যসেনের নেতৃত্বে অস্ত্র লুটে ভীত ইংরেজ প্রশাসন তাদের বিরোধ মতবাদকে দমনে হয়ে উঠে মরিয়া। এরই ধারাবাহিকতায় কলকাতা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কমরেড মণিকে। ৫ বছর কাটে উপমহাদেশের বিভিন্ন জেলে। নিজ গ্রাম সুসং এ অন্তরীন অবস্থায় ও নিয়মিত হাজিরাদানের শর্তে ১৯৩৫ সালে জেল থেকে ছাড়া পান এই বিপ্লবী।

১৯৩৭ সালে জেল থেকে বেরিয়ে এসে দুর্গাপুরের মুসলমান কৃষক ও গাড়ো হাজংদের পক্ষে ‘টংক প্রথা’র বিরুদ্ধে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এরপর মণি সিংহ টংক আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। খোদ নিজ পরিবারের সামন্তদের নির্মম অত্যাচারের পীড়িত করে কমরেড মণি সিংহকে। যদিও প্রথমে নানাবিধ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন। কিন্তু পরবর্তীতে মার্কসীয় শিক্ষার আলোকে নিজেকে চালিত করে ঐসব ভুখা-নাঙ্গাদের মুক্তির মিছিলের নেতৃত্বে চলে আসেন তিনি। গড়ে তুলেন দুর্বার আন্দোলন। নিজ পারিবারের সামন্তগণ এই বিদ্রোহীর ভয়ে ভীত-স্বতন্ত্র হয়ে তাদের প্রভু ইংরেজদের সহায়তায় আবারো জেলে পাঠায় মণি সিংহকে।

মণি সিংহ ১৯৪০ এ ময়মনসিংহ জেলা কমিউনিস্ট এর সেক্রেটারি হন। ১৯৪১ সালে আবার গ্রেপ্তার হন। ১৫ দিন আটক রাখা হয়। ছাড়া পেয়ে আত্মগোপনে চলে যান। ১৯৪৫ এ নেত্রকোনা’র নাগড়া তে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলনে অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান, ১৯৪৬ এ ভারতের সাধারণ নির্বাচনে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে পার্টি’র হয়ে নির্বাচন করেন। ১৯৪৬-৪৭ এ তিনি তেভাগা আন্দোলনে রাখেন অসামান্য অবদান রাখেন।

দেশভাগের পর আইয়ুব সরকারের হুলিয়া মাথায় নিয়েও মা-মাটির টানে রয়ে যান পূর্ব-পাকিস্তানে। পাকিস্তান সরকার মই চালায় উনার ভিটেতে। উনার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। ১৯৪৮ এ নামেন টঙ্ক প্রথা বন্ধ করতে। ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মণি সিংহ।

১৯৫০ সালে ভীত পাকিস্তান সরকার তীব্র আন্দোলনের মুখে বিলুপ্ত করেন টঙ্ক প্রথা। চালু করে টাকায় খাজনা। কৃষকের জমি স্বত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। টঙ্ক আন্দোলনের বিভিন্ন সময় নারী-পুরুষ-শিশু সমেত প্রায় ৬০ জন বলিদান হন।

পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ পার্টি কমিউনিস্ট ও এর নেতা কমরেড মণি সিংহকে ধরিয়ে দিতে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে আইয়ুব সরকার। হুলিয়া মাথায় নিয়ে ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত আত্মগোপনে থেকেও অব্যাহত রেখেছেন লড়াই-সংগ্রাম। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন। ৫৪ এর প্রাদেশিক নির্বাচন। ৫৬ তে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বীকৃতি আদায়ে, ১৯৬১ এর শিক্ষক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।

১৯৬১ সালের নভেম্বর; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, কমরেড মণি সিংহ, কমরেড খোকা রায়, ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সংবাদ সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী মিলিত হন ঢাকার মগবাজারের এক বাসায়। আলোচনা করেন দেশের চলমান রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে। নানা মত-পথে সংঘর্ষ ঘটার পরে একাধিক বৈঠকে ঐক্যমত্যে পৌঁছান নায়ক-মহানায়কগণ। বিকশিত হয় পুষ্প, শুরু হয় সংঘবদ্ধ আন্দোলন ছাত্র-জনতার। এই মিটিংকে বঙ্গের বোদ্ধাগণ পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সেতু বলে আখ্যায়িত করেছেন।

১৯৬৭ সালে গ্রেপ্তার হন আত্মগোপনে থাকা মণি। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের চাপে অন্যান্য রাজবন্দীর সঙ্গে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। এ বছরের জুলাইতে আবার গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীকালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় অনেক নেতাকে মুক্তি দিলেও, ইয়াহিয়া সরকার মণি সিংহকে মুক্তি দেয়নি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বন্দীরা রাজশাহীর জেল ভেঙ্গে তাকে মুক্ত করেন। তিনি ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী গড়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে তাকে নির্বাচিত করা হয়। এসময়ে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে রাখেন অসামান্য ভূমিকা। বিশেষত রুশ সরকার-ভারত সরকারের সমর্থন আদায়ে। এই সালেই মেটিয়াব্রুজের আন্দোলনের নায়ক কমরেড মণি সিংহকে বাংলার প্রথম রেড ফ্লাগ এর প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে কলকাতায় শ্রমিকগণ সম্মানিত করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয়ভাজন মণি দা, ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুকে আমন্ত্রণ জানান বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কাউন্সিলে। প্রিয় মণি দা’র আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত হন কাউন্সিলে। কাউন্সিলে তিনি নির্বাচিত হন সভাপতি হিসাবে। পরবর্তী তৃতীয় কাউন্সিলে ১৯৮০ সালে পুনরায় নির্বাচিত হন সভাপতি হিসাবে এবং ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত উক্ত পদে স্থায়ী ছিলেন নিজ দলের প্রিয়ভাজন “বড়ভাই”।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন স্বপ্ন ভাঙে তবুও হাল ছাড়েন নি বঙ্গবন্ধুর মণি দা। প্রতিবাদ করেন বঙ্গবন্ধু হত্যার। ১৯৮০ সালে জিয়া সরকার গ্রেপ্তার করে কমরেড মণি সিংহ ও কমরেড ফরহাদকে। পরবর্তীতে পার্টির দূর্বার আন্দোলনে মুক্ত হন “বড়ভাই”। চাঙ্গা করে তুলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। কিন্তু গুরুতর অসুস্থ হয়ে ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শয্যাশায়ী হন কমরেড মণি সিংহ।

১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর সকাল ১০ টা ৫০ মিনিটে ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অসংখ্য নেতা কর্মীদের বড়ভাই, হাজংদের বেটা, বঙ্গে লাল ঝাণ্ডার স্থাপক, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তি আন্দোলনের মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধের সফল সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর মণি দা। বিভিন্ন সময়ে দেশ-জাতির কল্যাণে অবদান এর স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে এই প্রবাদ পুরুষকে।

মৃত্যুর পর কমরেড মণি সিংহের স্মৃতি-রক্ষার্থে পার্টি ও তাঁর সন্তান ডা. দিবালোক সিংহ সুসং দুর্গাপুরে “মণি সিংহ স্মৃতিস্তম্ভ” স্থাপন করেন। সেখানে প্রতিবছর ২৮ জুলাই পালন করা জন্মবার্ষিকী ও ৩১ ডিসেম্বর থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে আয়োজিত হয় “মণি মেলা”।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮ জুলাই ২০০০ সালে এই বিপ্লবীর জন্মশতবার্ষিকীতে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন- মণি সিংহের ত্যাগ, আদর্শ, সততা, নিষ্ঠা ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পুনরুজ্জীবিত হউক। তিনি হয়ে উঠুক তরুণ বিপ্লবীদের আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস।

আমৃত্যু যিনি ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার। খেটে-খাওয়া কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের প্রাণের নেতা। মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের রাজনীতি, দর্শন ও আদর্শ যার অনুপ্রেরণা। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমৃত্যু যিনি লড়েছেন। সততা, আত্মত্যাগ, আদর্শনিষ্ঠা, কঠোর শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্ববোধ, গভীর দেশপ্রেম, শোষিত-নির্যাতিত মেহনতি মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক ছিলেন কমরেড মণি সিংহ। জন্মদিনে ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল চিরঞ্জীব কমরেড মণি সিংহের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

** তথ্যসূত্রঃ “জীবন-সংগ্রাম: কমরেড মণি সিংহ”- জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ঢাকা। ‘অবিভক্ত বাঙলার কৃষক সংগ্রাম: তেভাগা আন্দলোলনের আর্থ- রাজনৈতিক প্রেক্ষিত- পর্যালোচনা- পুনর্বিচার’ – সুস্নাত দাস (নক্ষত্র প্রকাশন, কলকাতা), gunijon, risingbd, newsg24, Wikipedia )

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular